বৈরী হতে থাকা জলবায়ু নিয়ে একটা গল্প | ছোট গল্প

       মনোযোগ দিয়ে তরুর পেঁয়াজ এবং কাঁচামরিচ কাটা দেখছিল জুঁই। এত নিখুঁত কাজ মেয়েটার ! কাঁচামরিচ নিয়ে সেটাকে লম্বায় চিরে আবার কুচি কুচি করে কাটছিল। লম্বায় দুদিক থেকে দুবার চিরে নিয়েছে তাই কুচিগুলো খুব মিহি হয়েছে। ওকেও শেখাচ্ছে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচগুলো কুচোতে কুচোতে। লাভ কি ! মনে মনে জুঁই ভাবে। সব তো পেটেই চলে যাবে চিবিয়ে আয়েশ করে খাবার পর। সেটা আর বলল না জুঁই তরুকে। মেয়েটা খুব ভাল মনের মেয়ে। ওকে যে শেখাচ্ছে তাতে ‘আমি পারি, তুমি পারনা’ – এই অহংবোধ নেই। সরলমনেই শেখাচ্ছে। দৌড়াদৌড়ি করে নাস্তা তৈরি করে ফেলল।

short story, ajkerblog, ajkerit,

-আপু শুধু ডিমটা ভাজব এখন। তোমার ক্ষুধা পেয়েছে না খুব?

-আরে নাহ ! তুমি অযথা চিন্তা করোনা আমাকে নিয়ে।

 

তরু চাকরি করে। বাসা এত সুন্দর করে সামলে অফিস করে কি করে ও ! অবাক হয়ে জুঁই ভাবে। জুঁই ওর পুরনো শহরটাকে দেখতে এসেছে। কাশেমের জোরাজুরিতে ওর বাসাতেই উঠেছে। খুব দ্বিধা ছিল ওর এখানে ওঠা নিয়ে। কিন্তু তরু এত আন্তরিকতা দেখিয়েছে যে ওর দ্বিধাগুলো কোথায় যেন উবে চলে গিয়েছে জলীয়বাষ্পের মত। সিমলা সামার হিলের একটা বাড়ির কিচেনে বসে তরুর সাথে গল্প করছিল। কাশেম আর ওর ছেলে এখনো ঘুমোচ্ছে।

 

-কি দুই বোনে গল্প করতিছ ?

-হয়।

রতনকে অনুকরণ করে বলল জুঁই। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে নিজেদের ভিটেমাটি দেখতে গিয়েছিল। তখন নতুন করে নিজের অঞ্চলের ভাষা শিখে এসেছে।

 

-আজকে তোমার প্রোগ্রাম কি ?

-আজকের প্রোগ্রাম হনুমান মন্দিরে যাব আজক্বে।

ওদের ছেলে এসে পাশে দাঁড়াল একটু পর। তরু বলল,

-বাবা উঠেছ ঘুম থেকে ? চল নাস্তা করবে। আমরা তোমার জন্য বসে আছি।

                     -দেখ। সাবধানে চলাফেরা কোরো আজকে।

-কেন ? হঠাৎ এরকম করে বলছ কেন তুমি ?

-বলতাম না। আসলে ভয় দেখানো আমার উদ্দেশ্যও নয়।

-তবে ..

 

-গতকাল অনেক রাতে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দিল একটা এই এলাকা নিয়ে। আমার একটু খটকা লাগছে তাতে। এজন্য বলছি।

-কি ভবিষ্যৎবাণী দিল আবোহাওয়া অফিস ?

তরু জানতে চাইল।

 

-বলল হঠাৎ নাকি ঝড় হতে পারে এখানে, সাথে লু হাওয়া বয়ে যাবে এই পুর সিমলার উপর দিয়ে।

-কি বল ! এরকম ঠাণ্ডা একটা জায়গা। আর ক’দিন পর মাইনাসে নেমে যাবে তাপমাত্রা। সেখানে..

-সেটাই তো ভাবাচ্ছে  আমাকে।

 

নাস্তা খেয়ে জুঁই বেরিয়ে গেল। তরু থেকে গেল ওর দুপুরের খাবার আয়োজন করার জন্য। ছুটি নিয়েছে অফিস থেকে আজ ওকে ভাল করে খাওয়াবে বলে।  রতন অফিসের দিকে গেল, সাথে ছেলেকে নিয়ে বেরোল। স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাবে। তরুকে অনুরোধ করেছিল ওর সাথী হতে। মেয়েটা শুধু ঘর আর চাকরির মধ্যেই ডুবে থাকে সারাক্ষণ। বাইরে বেরোয়না বললেই চলে। জুঁই চেয়েছিল আজ অন্তত একবার বাইরে বেরোক ও – প্রাণভরে শ্বাস নিক মুক্ত বাতাসে। রাজী করাতে পারল না। ওকে  রেঁধে খাওয়াবে এই সুখেই ও খুশী। বাসা থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে এল জুঁই। তারপর হেঁটে পৌঁছে গেল হনুমান মন্দিরের পাদদেশে। উঠতে শুরু করল উপরে পাকদণ্ডী বেয়ে। 

 

 

অনেকটা উপরে যেতে চোখে পড়ল গাছে ঘেরা জায়গায় একটু একটু পর পর অনেকগুলো হনুমানের লম্বা মূর্তি। অপরূপ কারুকাজ মূর্তিগুলোর। একটা করে দেখছিল আর মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলে যাচ্ছিল ও। নিজের মধ্যেই মগ্ন হয়েছিল। একটা জায়গায় আসতে  কোলাহলের মত কানে আসতে মগ্ন-ভাবটা কেটে গেল। চোখ তুলে দেখল সামনে একটা কফিশপ। সেখানে দর্শনার্থীরা ভীড় করে কফি খাচ্ছে। কফি খাওয়া দোষের নয় মোটেই; কিন্তু এই শপটা তৈরি করতে বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। আর দর্শনার্থীদের কথা, গল্প, আড্ডা এবং কাপ-প্লেটের টুংটাং শব্দ জায়গাটার পবিত্রতা কিছুটা হলেও তো পরিবেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন  করেছে।       

                          ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে প্রথমে তরু দেখল সাড়ে বারোটা বাজে। ঘুরে আবার রান্নাঘরের দিকে যেতে যেয়ে থেমে গেল। থেমে যেয়ে আবার ভাল তাকিয়ে দেখল সাড়ে বারোটা নয় বারোটা পনেরো বাজে। ঘড়িটায় দিকে হঠাৎ তাকালে  স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’র পায়ের অংশটা ঘড়ির একটা কাঁটা বলে ভুল হয়। তাই দ্বিতীয়বার তাকিয়ে সন্দেহ মোচন করতে হয়। রতন ফিরে আসবে বিকেলে, বাবুকে স্কুল থেকে নিয়ে আসবে আসবার সময়। জুঁই আপু এখনো ফিরে আসেনি। তরুর রান্না শেষ। এখন ঘরগুলো গুছিয়ে শাওয়ার নিবে। অন্যদিন তো গুছনোর সময়ই পায়না। একমাত্র রবিবার – সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া। সব ঘর গুছিয়ে বসার ঘরে বসল। বসে সেন্ট্রাল টেবিল থেকে রিমোট নিয়ে টেলিভিশন অন করল। গতকালের একটা সিরিজও দেখা হয়নি ওর। 

 

 

এখন পুনঃপ্রচার দেখবে – এরকমই ইচ্ছে ওর। হঠাৎ মনে হল কপালে হালকা বিনবিনে ঘাম জড় হয়েছে বলে মনে হল ওর। হাতটা কপালে যেতে দেখল সত্যি তাই। কি ব্যাপার ! এখানে তো ঘাম হওয়ার সুযোগই হয়না শরীরে। তবে আজ কেন ! একটু মনে হচ্ছে গরম অনুভূতও হচ্ছে ওর। প্রেসার বাড়ল কি !! গায়ের পাতলা সোয়েটার খুলে রাখল সোফার একপাশে। রুম হিটারের টেম্পারেচারটাও কমিয়ে আনল একটু। এমন সময়ে দরজায় টোকা পড়তে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল নিজের অজান্তেই। নিশ্চয়ই রতন ফিরে এক বাবুকে নিয়ে। ওর ভীত মন একবারের জন্যও এটা ভাবতে পারল না যে রতনের ফেরার সময় এটা নয়, বাবুর স্কুল ছুটির সময়ও এটা নয়। দরজা খুলে দিতে জুঁই প্রবেশ করল ঘরে।

 

-কি ব্যাপার ! তুমি কি অসুস্থ ?

– নাহ জুঁই আপু। কেন বলছ একথা ?

-তোমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

-এসো , ভেতরে এসো।

বলে ওকে এক হাতে জড়িয়ে বসার ঘর থেকে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। পাতলা একটা শাড়ি পরেছে জুঁই। তরুর হাত ওর গায়ের স্পর্শ পেতে বুঝতে পারল জুঁইও ঘেমে গেছে।

-তুমিও তো ঘেমে গেছে আপু !

-তাই ! বুঝতে পারিনি তো !! তবে হনুমান মন্দির থেকে ফেরার পথে গরম লাগছিল। ভাবলাম পাহাড় থেকে নেমেছি বলে.. । কিন্তু এখন তো আরও বেশী  গরমের অনুভুতি হচ্ছে। হিটারটা কমিয়ে দিবে প্লীজ !

-কমিয়েছি আপু। তবু গরম লাগছে।    

                       কয়েকদিন পর রতনদের বসার ঘরে তরু, জুঁই , কাশেম আর ওদের ছেলে বসে আছে  কফির কাপ হাতে। চিন্তা করছে সবাই গত দিন ক’টার বিভীষিকা নিয়ে। সেদিন জুঁই ফিরে আসার পর পরই হালকা ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছিল। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ ছিল না , বরং গরম একটা হল্কার মত চোখেমুখে এসে লেগেছিল ওরা বসার ঘর থেকে বাইরে মুখ বের করতে। দরজা বন্ধ করে বসেছিল দুজন। ঝড়ের সময় একটু একটু করে রুমের হিটারের তাপমাত্রা কমিয়ে দিচ্ছিল তরু। কারণ বাইরে তাপমাত্রার সাথে পাল্লা দিয়ে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করেছিল। রতন ছেলের সাথে ফিরে এসেছিল অনেকটা বিধ্বস্ত পাখির মত হয়ে। 

 

 

কারণ বাইরের ঝড়ের গতি তখন বেড়ে গিয়েছে অনেক। দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার সময় নিজেকে স্থির রাখা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশঃ । কোনমতে নিজেদের সামলে বাসা পর্যন্ত আসতে পেরেছিল দুজন। তারপর এই ক’দিন গরমে শুধু সেদ্ধ হতে বাকী থেকেছে ওদের। তাপমাত্রা ছুঁয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ ডিগ্রী সেলসিয়াসের ঘর। 

 

 

শীত-প্রধান এলাকা বলে কোন বাসায় এয়ার কুলার ছিল না। তাই গরমটা অসহ্য হয়ে ধরা দিত এদের কাছে। জুঁই কিছুটা অভ্যস্ত ছিল পরম তাপমাত্রায় , তবু পঞ্চাশের অভিজ্ঞতা ছিল না, হয়নি কখনো। ওদেশ থেকে মলয় বার বার ফোন করেছে,

-কি অবস্থা তোমাদের ? খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার ??

-নাহ !

কষ্ট হলেও মলয়কে এটা বলে আর বিব্রত করতে চায়নি ও। এমনিতেই সবাই দুশ্চিন্তায় আছে ওকে নিয়ে। পরশু প্রথম বিমানেই ও ফিরে যাবে।

 

               গল্পের ফাঁকে বাইরে দৃষ্টি গেল জুঁইয়ের। লম্বা আলখাল্লা পরিহিত একটা মানুষ , হাতে একটা দা’য়ের মত যন্ত্র নিয়ে এগাছে একবার , ওগাছে একবার কোপ দিচ্ছে আর মুখে স্থানীয় ভাষায় কি যেন  বলছে। গরমে ম্রিয়মান-প্রায় কাশেমের কণ্ঠ থেকে বেরোল,

 

-গত ক’বছর আগে  হনুমান মন্দিরে গাড়ী ওঠার রাস্তা তৈরির সময় গাছ কাটা হচ্ছিল। ওর দশ বছরের বাচ্চাটা তখন বনের মধ্যে খেলছিল। হঠাৎ একটা গাছ যেয়ে ওর গায়ের উপর পড়ে। হাসপাতাল-পর্যন্ত নেওয়ার সময় না দিয়েই বাচ্চাটা মারা যায়।সেই থেকে বনে বনে ঘরে বেড়ায় লোকটা হাতের অস্ত্রটা নিয়ে। আর গাছে গাছে কোপ দেয় এভাবে। জুঁই ভাবে এ যেন পরিবেশকে বাঁচানোর নীরব প্রতিবাদ করে যাচ্ছে লোকটা। 

 

 

ওদের দরজাটা খোলা পেয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। ওকে এভাবে আসতে দেখে তরু জড়সড় হয়ে জুঁইয়ের গা ঘেসে বসল। জুঁই বুঝল যে তরু ভয় পেয়েছে। নিজেও যে পায়নি, সেটা বলতে পারবেনা। পেলেও তরুকে স্থির  রাখার জন্য প্রকাশ করল না। লোকটা দরজা দিয়ে মুখ সামান্য ঢুকিয়ে বলে উঠল রতনকে লক্ষ্য করে,

-হেই বাবু আর গাছ কাটিবেক লাই ?

বলেই যেমন এসেছিল তেমন করেই চলে গেল। কিন্তু ওদের মনে একটা প্রশ্নের আঁচড় এঁকে দিয়ে গেল। জুইয়ের মনে হল বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বাঁচানো নিয়ে কত সভা, সেমিনার চলছে পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটিয়ে বা সড়ক ও জনপথের অনুমতি  নিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে গাছ কাটাও হচ্ছে। একই পৃথিবীতে একই মানুষের তৈরি দু’রকমের কার্যকলাপে সন্তান হারাচ্ছে কেউ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *